সোহেল মিয়া, দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ)
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পান্ডারখাল বাঁধ—যে বাঁধ একসময় দেখার হাওরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি রক্ষা এবং মানুষের অবসর বিনোদনের অন্যতম স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। আজ তা প্রভাবশালীদের অবৈধভাবে বালু-পাথর মজুদ ও ইট- পাথর ভাঙার ক্রাশার মেশিনের দখলে থাকায় ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলেও কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন। অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনের কিছু কতিপয় কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই চলছে গুরুত্বপূর্ণ বাঁধে ধ্বংস তান্ডব।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৪ সালে পান্ডারগাঁও ইউনিয়নের দেখার হাওর এবং আশপাশের ছোট-বড় হাওরের ফসল রক্ষায় মান্নারগাঁও ইউনিয়নের শ্যামলবাজার এলাকায় বাঁধটি নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে বাঁধের দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হলে এটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য স্থানে পরিণত হয়। যা উপজেলার সবচেয়ে সুন্দর জায়গায় পরিনহ হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়দের কাছে এটি ছিল একটি পর্যটনকেন্দ্রের মতো।
কিন্তু গত কয়েক বছরে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বাঁধের দুই পাশে গড়ে উঠেছে বালু ও পাথরের স্তূপ। প্রতিনিয়তো ক্রাশার মেশিন দিয়ে ইট-পাথর ভাঙায় পরিনত হয়েছে এক কারখানায়। ফলে বাঁধের দু’পাশে থাকা শত-শত গাছ ইতোমধ্যে উজার হয়ে গেছে। গাছ বিলুপ্ত হওযার পাশাপাশি বালু, আর ইট-পাথরের কারনে বাঁধের আয়তন ছোট হয়ে আসছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি মহল প্রশাসনিক নজরদারির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শ্যামলবাজারসংলগ্ন পান্ডারখাল বাঁধের বিস্তীর্ণ এলাকা বালু-পাথর কারবারিদের দখলে রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। একসময় যেখানে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানুষ সময় কাটাতেন, সেখানে এখন ভারী নির্মাণসামগ্রীর আধিপত্য। ফলে ধ্বংস হচ্ছে অর্ধশত বছর আগে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী বাঁধটি। ঝুঁকিতে পড়েছে চলাচলের সড়ক, পরিবেশ রক্ষাকারী গাছ ও স্থানীয় স্থাপনা।
পথচারী ফারুক মিয়া বলেন, “এই বাঁধ শুধু একটি সড়ক নয়, এটি আমাদের এলাকার ফসল, জননিরাপত্তা ও মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিন্তু বর্তমানে বালু-পাথরের কারখানায় পরিনত হওয়ায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে। স্থানীয় প্রশানের কোন নজরদারি নেই। বলে মনে হচ্ছে উনাদের মদদেই চলছে এসব।
স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী মাহবুব রানা বলেন, “আগে বন্ধুদের সঙ্গে এখানে এসে সময় কাটাতাম। এখন চারদিকে বালু-পাথর আর পাথর ভাঙ্গার মেশিন। বাঁধের সৌন্দর্য বলে কিছুই অবশিষ্ট নেই।” প্রশাসন চাইলে বাঁধটিকে রক্ষা করতে পারত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলায় বাঁধসংলগ্ন এলাকায় জুয়ার আসরসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। বাঁধের ওপর এবং আশপাশে ভারী নির্মাণসামগ্রী রাখার কারণে
বাঁধের আকার কমে গেছে।
স্থানীয়দের মতে, বাঁধের গাছপালা কেটে ফেলার ফলে পরিবেশগত ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারি অর্থায়নে নির্মিত বসার ছাউনি ও বিশ্রাম বেঞ্চগুলোর অনেকগুলোই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দু’পাশের সারিবদ্ধ গাছ গুলো কেটে নেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত নজরদারির দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় ইউপি সদস্য জুয়েল আহমদ জানান, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার উপজেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও কিছুদিনের মধ্যে আবার আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—অভিযানগুলো কেন দীর্ঘমেয়াদি ফল দিচ্ছে না এবং কেন অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতার অভাবের কারণেই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না।
বাঁধটি রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে স্থানীয়রা বলেন, পান্ডারখাল বাঁধকে অবৈধ দখলমুক্ত করতে দ্রুত যৌথ অভিযান পরিচালনা, দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বাঁধের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
এ বিষয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরূপ রতন সিংহ বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। খুব শিগগিরই সরেজমিনে গিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে বাঁধটি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”



