Shopping cart

Magazines cover a wide array subjects, including but not limited to fashion, lifestyle, health, politics, business, Entertainment, sports, science,

আত্মসম্মানের ৪৬ বছর: অন্ধ হয়েও জীবনের সাথে অদম্য লড়াই

মে ২৪, ২০২৬

আত্মসম্মানের ৪৬ বছর: অন্ধ হয়েও জীবনের সাথে অদম্য লড়াই।

আত্মসম্মানের ৪৬ বছর: অন্ধ হয়েও জীবনের সাথে অদম্য লড়াই।

সাজু আহমেদ: জীবন নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই আমাদের। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকেই হতাশায় ডুবে যান। অথচ মণিরামপুর এক সংগ্রামী মানুষের জীবনচিত্র দেখলে সেই সব অভিযোগ যেন ম্লান হয়ে যায়। তিনি নিখিল কুমার। দৃষ্টিহীন হলেও আত্মসম্মান আর ইচ্ছাশক্তি নিয়ে টিকে আছেন কঠিন জীবনের লড়াইয়ে।

উপজেলার ঢাকুরিয়া ইউনিয়নের কুড়ুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রতন কুমারের ছেলে নিখিল কুমার দীর্ঘ তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে বাদাম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। জন্মগতভাবে নয়, জীবনের এক পর্যায়ে তিনি হারান তার দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি। কিন্তু দমে যাননি। আত্মমর্যাদা আর পরিশ্রমকে সঙ্গী করে প্রতিদিন দুই থেকে তিন কেজি বাদাম বিক্রি করে চালাচ্ছেন সংসার।

দৃষ্টিশক্তি না থাকায় প্রতিটি পদক্ষেপেই ঝুঁকি। বাড়ি থেকে বাজারে যাওয়া কিংবা বৈদ্যুতিক চুলায় বাদাম ভাজা সবকিছুতেই থাকে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। তবুও থেমে নেই তার পথচলা। বিকেলে নিজেই বাদাম ভেজে সন্ধ্যার পর ঢাকুরিয়া বাজারে গিয়ে বাঁশি বাজিয়ে উপস্থিতির জানান দেন। তার সেই পরিচিত সুর শুনেই দোকানীরা বুঝে যান নিখিল এসেছেন।

নিখিল কুমার বলেন, ‘যখন আমার পাঁচ-সাত বছর বয়স, সেই সময় নিউমোনিয়া হয়েছিল। সেই সময় আমার চোখ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তখন আমি দিনের বেলায় দেখতে পেতাম, রাতে পেতাম না। তারপরে অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি। তারা বলেছিল, চোখ আর ভালো হবে না, আস্তে আস্তে বয়স বাড়ার সাথে ধুমা এসে যাবে। এখন সেই ধুমাই এসে গেছে, এখন দিনের বেলায় ঝাপসা ঝাপসা ধুমা দেখা যায় আর রাতে অন্ধকার।’

‘আমি কানের জোরে চলাফেরা করি। বাড়ি থেকে আধা কিলো দূরে বাজার। প্রতিদিন বিকেলে দুই থেকে তিন কেজি করে বাদাম নিয়ে যাই। তা থেকে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা আয় হয়। এই দিয়ে সংসার চলে,’ বলেন নিখিল।

তিনি জানান, তার প্রথম স্ত্রী লক্ষ্মী রানী। তিনিও চোখে কম দেখতেন। তাদের সংসারে দুই সন্তানের জন্ম হয়। ভালোই চলছিল সংসার। একদিন রান্নার সময় অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান লক্ষ্মী। কয়েক বছর পর নতুন সংসার শুরু করেন নিখিল। দ্বিতীয় স্ত্রী বিশ্বাভও মানসিক প্রতিবন্ধী। এখন দুই সন্তান আর অভাগা স্ত্রীকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে জীবন চলছে তার। ঝড়-বৃষ্টি, তীব্র গরম বা শীত- প্রকৃতির কোনো প্রতিকূলতাতেই বিশ্রাম নেই নিখিলের। কারণ একদিন কাজ না করলে চুলা জ্বলে না। প্রতিদিনের এই সংগ্রামই তার জীবনের বাস্তবতা।

ইসমাইল হোসেন, ইমন হোসেনসহ কয়েকজন প্রতিবেশী জানান, নিখিল ঠিকমতো দেখতে পারেন না। রাস্তায় চলতে গিয়ে প্রায়ই সাইকেল, রিকশা বা ইজিবাইকের আঘাত সহ্য করতে হয়। চোখে না দেখায় আলাদা দক্ষতা তৈরি হয়েছে নিখিলের। কেউ বাদাম কিনে টাকা দিলে হাতের ঘষায় তিনি ঠিকই বুঝে যান, এটা কত টাকার নোট বা কয়েন। একইভাবে বাদাম মাপার ক্ষেত্রেও তার দক্ষতা অসাধারণ।ভিক্ষা না করে নিজেই উপার্জন করেন, এটা বেশ ব্যতিক্রমী কাজ।

নিখিলের বড় ভাই প্রদীপ বলেন, ‘১২-১৪ বছর বয়সে একটা বড় ধরনের অসুখ হয়েছিল। তারপর চিকিৎসা করা হয়, তাও কোনো উপকার হয়নি। অনেক জায়গায় নেওয়া হয়েছে, বাবা নিয়ে গেছে বেঁচে থাকাকালীন। এখন সে মোটেই দেখতে পারে না।’

স্থানীয়দের কাছে খুবই পরিচিত মুখ নিখিল। ঢাকুরিয়া বাজারের এমন কোনো দোকানি নেই, যিনি তার বাদাম খাননি। নিখিল দেখিয়েছেন, চরম প্রতিকূলতার মাঝেও মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার নামই জীবন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *