Shopping cart

ব্রহ্মপুত্রে নাব্যতা সংকট: ফেরি চলাচলে চিলমারী-রৌমারী রুটে ভোগান্তি

মার্চ ১০, ২০২৬

ব্রহ্মপুত্রে নাব্যতা সংকট: ফেরি চলাচলে চিলমারী-রৌমারী রুটে ভোগান্তি।

ব্রহ্মপুত্রে নাব্যতা সংকট: ফেরি চলাচলে চিলমারী-রৌমারী রুটে ভোগান্তি।

রিয়াজুল হক সাগর, রংপুর: উত্তরের দারিদ্র্যপীড়িত জেলা কুড়িগ্রামে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পর ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ব্রহ্মপুত্র নদে রৌমারী-চিলমারী নৌরুটে ফেরি সার্ভিস চালু হয়। কিন্তু চালুর পর প্রায় আড়াই বছরের মধ্যেই নাব্য সংকটের অজুহাতে অসংখ্যবার বন্ধ হয়েছে ফেরি চলাচল। সর্বশেষ গত বছরের ১৯ নভেম্বর থেকে নাব্যতার সংকটের কারণে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে ফেরি। এতে উত্তরাঞ্চলের ১০ থেকে ১২টি জেলার যানবাহন ও সাধারণ মানুষের ঢাকা যাতায়াতে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী রমনা ঘাট দিয়ে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকা এবং রৌমারী প্রান্ত দিয়ে ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার যানবাহন এ রুট ব্যবহার করে আসছিল। ফেরি সচল থাকলে এ অঞ্চল থেকে ঢাকার দূরত্ব ১২০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত কমে যায়। ফলে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও কম হতো। ফেরি বন্ধ থাকায় পরিবহনগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে।

এতে বাড়তি সময়, জ্বালানি ও ভাড়া গুনতে হচ্ছে বলে কয়েকজন ট্রাকচালক জানিয়েছেন। ভূরুঙ্গামারীর আন্তঃজেলা ট্রাকচালক মোঃ আমিনুল ইসলাম ও মোঃ ফরিদ মিয়া বলেন, সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে নিয়মিত পাথর পরিবহন করতে হয়। রৌমারী-চিলমারী রুটে ফেরি চালু থাকলে সময় ও খরচ দুটোই কম লাগত।

আরেক ট্রাকচালক মোঃ হামিদুল ইসলাম বলেন, চিলমারী-রৌমারী রুটে ফেরি চলাচলের সময় দুই প্রান্তে পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘ সারি থাকত। কিন্তু বারবার নাব্যতা সংকটের কারণে ফেরি বন্ধ থাকায় বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ফেরি চালু রাখা গেলে অর্থনৈতিকভাবে এ এলাকা অনেক উন্নত হতো।

প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র নদের নাব্যতা কমে যাওয়ায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ফেরি চলাচল ব্যাহত হয়। তবে চলতি মৌসুমে আগাম পলি জমে চ্যানেল সংকুচিত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, বালুচর জেগে ওঠা এবং বেসিন এলাকায় পর্যাপ্ত গভীরতা না থাকায় ফেরি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে এ রুটে নিয়োজিত দুটি ফেরি—‘কদম’ ও ‘কুঞ্জলতা’—রৌমারী প্রান্তে পন্টুনের সঙ্গে চরাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। বেসিন এলাকায় কার্যকর ড্রেজিং না হওয়ায় ফেরি দুটি বালুচরে আটকে রয়েছে। এতে ফেরিগুলোর যান্ত্রিক ক্ষয়ক্ষতি ও অবকাঠামোগত ঝুঁকি বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘদিন এভাবে পড়ে থাকলে সরকারের কয়েক কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হতে পারে।

বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানায়, নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করে গত বছরের ৬ ডিসেম্বর ড্রেজিংয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়। এ ছাড়া ১ ও ১৭ ডিসেম্বর এবং চলতি বছরের ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি, ৮ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখেও একাধিকবার পত্র পাঠানো হয়েছে। তবুও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ফেরি চালু হওয়ার পর ওই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১০৪ দিনের মধ্যে ৯৭ দিন ফেরি চলেছে। এ সময়ে ২ হাজার ৮৮৫টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৬৬ দিনের মধ্যে ২৪১ দিন ফেরি চলেছে। এ সময়ে ৬ হাজার ৫৬২টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। আর ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ২১৮ দিনের মধ্যে ফেরি চলেছে মাত্র ৬৮ দিন। এ সময়ে পারাপার হয়েছে ২ হাজার ২৫০টি যানবাহন।

২০২৪ সাল থেকেই ফেরি চলাচলে বিড়ম্বনা বাড়তে শুরু করে। ওই বছর ফেরি চলেছে ২৪১ দিন, বন্ধ ছিল ১২৫ দিন। ২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিসির চিলমারী-রৌমারী অঞ্চলের সহকারী ব্যবস্থাপক (হিসাব) মোঃ নুরন্নবী সরকার বলেন, পরিবহনের চাপ ও ফেরির চাহিদা বিবেচনায় শুকনো মৌসুমে ড্রেজিং জোরদার করলে কমপক্ষে চারটি ফেরি প্রয়োজন হবে। সারা বছর সার্ভিস সচল রাখা সম্ভব। জ্বালানি খরচ বিবেচনায় এ রুট নিয়মিত লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফেরি চালু থাকলে কম ড্রাফটের ফেরি নিয়োগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছে বলেও জানান তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নাব্যতা রক্ষায় পরিকল্পিত ও টেকসই উদ্যোগের অভাব রয়েছে। প্রয়োজনীয় গভীরতায় খনন না করা, চ্যানেল নির্ধারণে দুর্বলতা এবং সময়মতো ড্রেজিং না হওয়ায় প্রতিবছর একই সংকট তৈরি হচ্ছে।

রৌমারী ফেরিঘাটের হোটেল মালিক মোঃ আকবর আলী বলেন, ফেরি চলাচল করলে বিভিন্ন এলাকার যানবাহন ও মানুষজন আসত। সে সময় বেচাকেনাও ভালো হতো।

এদিকে, ফেরি বন্ধ থাকায় যাত্রী ও পরিবহন মালিকদের নৌকায় পারাপার করতে হচ্ছে। ফলে বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকায় পারাপারে নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। বাড়তি ভাড়া নিয়ে প্রায়ই যাত্রীদের সঙ্গে নৌকা মালিকদের বাকবিতণ্ডা হচ্ছে।

তবে নাব্যতা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) দাবি করেছে, নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ও চর সৃষ্টির কারণে নাব্যতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী সমীর পাল বলেন, প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ড্রেজিং করে প্রায় ৪০ মিটার খনন করা হচ্ছে। আগামী এপ্রিল বা মে মাসের আগে ফেরি চালু করা সম্ভব হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *