দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ): আসন্ন মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব কোরবানির ঈদ। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় চলছে সর্বত্র ঈদের প্রস্তুতি। বসতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর হাট । পশু মোটাতাজাকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন গৃহস্থ ও খামারের মালিকেরা। এবার কোরবানির পশুর সংকট হবে না বলে দাবি করছেন উপজেলা প্রানীসম্পদ অফিস ও খামারিরা। তবে ভারতীয় গরু প্রবেশের শষ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষক ও খামার মালিকরা। সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশকালে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও কারবারিদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও নিয়ন্ত্রণে আসছেনা কারবার।
দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্র মতে, উপজেলায় গরুর খামার রয়েছে ৭০টির অধিক। আসন্ন ঈদুল আজহা -২০২৬ উপলক্ষে নয়টি স্থায়ী পশুর হাটের অনুমতি দেয়া হয়েছে। কোরবানির পশু প্রস্তুত রয়েছে ৬০০০ হাজারের অধিক। চাহিদা রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০।
সেই হিসাবে উপজেলায় উদ্বৃত্ত বা চাহিদার অতিরিক্ত পশু রয়েছে ১ হাজার ৫০০ পশু, যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো সম্ভব হবে, আশা প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও খামারিদের।
তবে,দোয়ারাবাজার উপজেলা ভারত সীমান্তবর্তী হওয়ায় অবৈধ পথে পশু প্রবেশ নিয়মিত কাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় গৃহস্থ ও খামারিদের হতাশার শেষ নেই।
খামার মালিক ও গৃহস্থরা জানায়, খাদ্য, চিকিৎসা ও বিদ্যুৎ বিলসহ শ্রমিকের মজুরি বাড়ার কারণে পশুপালনের ব্যয়ভার এবার দ্বিগুণ বেড়েছে। এতে গত বছরের তুলনায় এবার পশুর দাম চড়া না হলে বিপাকে পড়বেন কৃষকসহ উপজেলার খামারিরা। কিন্তু সম্প্রতি সীমান্তের বিভিন্ন স্পটে অবৈধ পন্থায় দেদারসে ভারতীয় গরু-মহিষ দেশে ডুকায় গৃহপালিত পশু ও খামারের পশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন খামার মালিক ও গৃহস্থরা।
তরুন খামারী আফজাল হোসেন বলেন, কোরবানির হাট শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগ থেকে সীমান্ত দিয়ে পশু অনুপ্রবেশ করায় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা। যার কারণে বাধ্য হয়ে খামারিদের কমদামে গরু বিক্রি করতে হয়।
এতে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার শঙ্কায় গরু নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
এদিকে প্রতিবছর কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দোয়ারাবাজার সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ করায় ক্ষতির সম্মুখীন হওয়াতে গরুর খামার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন উপজেলার উদ্যোক্তারা। ক্ষুদ্র খামারি নুর মোহাম্মদ বলেন, প্রতিবছর ঈদকে সামনে রেখে সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু আসার কারনে আমাদের ন্যায্য মূল্যের চেয়ে কমদামে গরু বিক্রি করতে হচ্ছে। গত বছর ভারতীয় গরুর প্রভাবে দেশীয় গরু বিক্রিতে লোকসান হয়েছে। যার কারনে এবার ঘরোয়াভাবে কয়েকটি গরু লালন-পালন করেছি। বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসন সতর্ক থাকলে দেশী গরুর কদর বাড়বে এবং আমরাও ন্যায্যমূল্য পাবো।
অন্যদিকে,বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের দাবি, এবার দোয়ারাবাজার সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় পশু চোরাইভাবে যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সীমান্তে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন তারা। বাড়ানো হয়েছে টহল ও নজরদারি। পাশাপাশি দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশেরও একই বক্তব্য।
তবে,রবিবার উপজেলার সবচেয়ে বড় গরুর বাজার সীমান্তবর্তী বাংলাবাজার এবং বোগলাবাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায় কোরবানির উপযোগী সারি সারি গরুর মিলন মেলা। বাজারে আসা নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, এ বাজারে খামার বা কৃষকদের পালিত দেশীয় গরু কম আসে। এখানে বেশির ভাগ গরু ভারতীয়। আর ভারতীয় এসব গরুর বৈধতা দিচ্ছে বাজার ইজারাদার। প্রতিটা গরু দেশে প্রবেশের পর ইজারাদার তাদেরকে সিট দিয়ে দেশীয় বানাচ্ছে। আর রুপ-পরিবর্তনকারী ভারতীয় গরু হেফাজতে রাখতে গড়ে উঠেছে অর্ধশত সেট। সেটে রেখেই ভারতীয় গরুর রমরমা ব্যবসা করছেন চোরাকারবারিরা। আর এসব চলছে উপজেলা প্রানী সম্পদ অফিস ও প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তাতের যোগসাজশে।
এ বিষয়ে দোয়ারাবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তরিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে অবৈধ পথে ভারত থেকে যাতে দেশে পশু আসতে না পারে, সেজন্য স্থানীয়দের সমন্বয় করে আমরা কাজ শুরু করেছি। পশুবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন স্থানে হয়রানি যাতে না হয় সেদিকেও বিশেষ নজর দেয়া রয়েছে। উপজেলার পশুর হাটগুলোতে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে। এছাড়াও খামারি, গৃহস্থ ও ক্রেতাদের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (২৮ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ কে এম জাকারিয়া কাদির বলেন, সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে ভারতীয় গরু প্রবেশ ঠেকাতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। চোরাকারবারিদের টার্গেটকৃত এলাকায় বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, বুধবার (১৩ মে) রাত ২ টার দিকে ভারতীয় গরু প্রবেশকালে বিজিবিদের সাথে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে চোরাকারবারিদের। এতে বেশ কয়েকজন বিজিবি আহদ হলেও ৮ টি ভারতীয় গরু আটক করা সম্ভব হয়।
পরেরদিন বিজিবি বাদী হয়ে ৭ জনের নাম উল্লেখ করে দোয়ারাবাজার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
