Shopping cart

রংপুরের শিক্ষার উজ্জল নক্ষত্র প্রফেসর ড. মুহাম্মদ রেজাউল হক আর নেই

ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬

রংপুরের শিক্ষার উজ্জল নক্ষত্র প্রফেসর ড. মুহাম্মদ রেজাউল হক আর নেই।

রংপুরের শিক্ষার উজ্জল নক্ষত্র প্রফেসর ড. মুহাম্মদ রেজাউল হক আর নেই।

রিয়াজুল হক সাগর,রংপুর: কারমাইকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ, রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন সমন্বয় পরিষদের আহবায়ক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ রেজাউল হক আর নেই।

আজ শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারী) সকাল ৯ টায় রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তিনি নিউমোনিয়া, ডায়াবেটিস ও বার্ধক্য জনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলা একাডেমির সহকারী পরিচালক আবিদ করিম মুন্না। মৃত্যুকালে তিনি মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক পুত্র আর দুইকন্যাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

এদিকে শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ রেজাউল হকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই রংপুরের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর চলে যাওয়ায় শুধু একটি প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এক অমূল্য দিশারী হারালো। তাঁর সৃষ্টিশীলতা, মানবিকতা ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব রংপুরের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে স্মরণ করবে বলে মন্তব্য করেছেন এ প্রজন্মের নেতৃত্বদানকারীরা।

রংপুরের আলোকিত মানুষ প্রফেস ড. মুহম্মদ রেজাউল হক ১৯৩৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কুড়িগ্রামের চিলমারীর ঐতিহ্যবাহী মিঞা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। রেজাউল হকের জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে চিলমারীতেই। ১৯৫০ সালে চিলমারী ইংলিশ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে ভর্তি হন কারমাইকেল কলেজে। ১৯৫২ সালে কারমাইকেল থেকে আইএসসি পাশ করলেও ফলাফল খুব একটা ভালো করতে পারেনি। এরপরে ভর্তি হন রাজশাহী কলেজের বাংলা বিভাগে। এখান থেকে স্নাতক সন্মানে দ্বিতীয় শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে তৃতীয় স্থান অর্জন করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি সরকারিভাবে পিএইচডির জন্যে মনোনীত হন । তাঁর গবেষণার কাজটি ভারতের কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পন্ন করেন তিনি।

প্রফেসর ড. মুহম্মদ রেজাউল হক বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৫৮ সালে থেকে সিলেট শহরের বেসরকারি মদনমোহন কলেজ থেকে।এরপর সরকারি কলেজে তাঁর সুদীর্ঘ পথচলা শুরু হয় ১৯৬১ সালের ৮ আগস্ট ঢাকা বিজ্ঞান কলেজে যোগদানের মধ্য দিয়ে। পরে তিনি ১৯৬৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৭ এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পদোন্নতি পেয়ে কারমাইকেল কলেজে ছিলেন। পিএইচডির পর তিনি ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় শহর রংপুরে। রংপুর কারমাইকেল কলেজে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে ছিলেন। ১৯৮৪ সালে গাইবান্ধা সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। অধ্যক্ষ ছিলেন দিনাজপুর সরকারি কলেজেরও। ১৯৯০ সালে অধ্যক্ষ হিসাবে ফিরে আসেন কারমাইকেল কলেজে এবং এখান থেকেই ১৯৯১ সালে অবসরে যান। কর্মজীবনে তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে ডাক পেয়েছিলেন। তিনি সেসব উপেক্ষা করে জড়িয়ে ছিলেন তাঁর প্রিয় শিক্ষকতা পেশায়।

তিনি সময় পেলেই লেখালেখি করতেন। ১৯৮৯ সালে বাংলা একাডেমি থেকে তাঁর গবেষণা কাজটি গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৯১ সালে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘ শোকাতুর সংগত ‘ প্রকাশিত হয় । বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১৮ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় রংপুরের আইডিয়া প্রকাশন থেকে বের হয়। এছাড়া তাঁর আরো অনেক প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও কবিতা বিভিন্ন পত্র- পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে । তাঁর প্রথম লেখা কবিতা যা তিনি ক্লাস এইটে লিখেছিলেন তার নাম ছিল ‘ হঠাৎ ‘।

রংপুরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের আহ্বায়ক ছিলেন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ রেজাউল হক। যার আহ্বানে “রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন সমন্বয় পরিষদ” গঠিত হয়েছিল। তাঁর নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিতি পায়। তিনি অনেক সমাজসেবী সংগঠনের দায়িত্বে ছিলেন।

আলোকিত এই মানুষটা একজন আদর্শ অভিভাবক ছিলেন। তাঁর এক ছেলে ও দুই মেয়ে। প্রকৌশলী ছেলে আছেন একটি বৃহৎ বেসরকারি কোম্পানিতে। বড় মেয়ে স্বামীসহ শ্রীলঙ্কায়। আর ছোট মেয়ে পেশায় চিকিৎসক, আছেন বারডেমে। তিনি ছিলেন একজন সফল শিক্ষক, বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, দক্ষ সংগঠক ও সমাজসেবক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *