সোহেল মিয়া, দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ): সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার সীমান্তে চোরাচালান ও মাদক পাচার বন্ধ হচ্ছে না কোনোভাবেই। গত এক বছরে সীমান্তে ব্যবসাকে কেন্দ্র করে তিনজন বাংলাদেশি কারবারি নিহত হলেও সীমান্তজুড়ে অব্যাহত রয়েছে মাদক, গরু ও বিভিন্ন পণ্যের পাচার। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে সীমান্ত দিয়ে বিদেশি অস্ত্র প্রবেশের গুঞ্জনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
জানা যায়, সর্বশেষ গত ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর–শ্যামারগাঁও এলাকার লাফার্জ সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয়ের কালাটেক বস্তি এলাকা থেকে আহাদ মিয়া (৪০) নামে স্থানীয় এক বাংলাদেশি কারবারির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ব্যবসায়িক কারনে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
এর আগে ১১ জুলাই দিবাগত রাতে উপজেলার বাগানবাড়ি সীমান্তের ১২১৬ নম্বর পিলারের কাছে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন শফিকুল ইসলাম (৪৫)।
একই বছরের ১০ এপ্রিল পেকপাড়া মোকামছড়া গ্রামের বাসিন্দা কুটি মিয়া (৫০) ভারতের মেঘালয়ের নথরাই পুঞ্জি এলাকায় খাসিয়াদের গুলিতে প্রাণ হারান।
অন্যদিকে, গত ২১ জুলাই সোনালী চেলা সীমান্ত এলাকা থেকে মো. সিরাজ মিয়া (৫০) ও মো. আলিমুদ্দিন (২৫) নামে দুই বাংলাদেশিকে ধরে নিয়ে যায় ভারতীয় বিএসএফ। এছাড়া ১০ আগস্ট বাংলাবাজার ইউনিয়নের মৌলারপাড় এলাকা থেকে তিন বাংলাদেশি নাগরিকসহ ১৪টি গরু আটক করে বিএসএফ। পরে বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকের মাধ্যমে এসব ঘটনার সমাধান হয়।
চোরাচালানের পাশাপাশি অস্ত্র পাচারের ঘটনাও উদ্বেগজনক। ২৭ আগস্ট গভীর রাতে বাংলাবাজার ইউনিয়নের মৌলার ব্রিজ এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৬ রাউন্ড গুলিসহ একটি বিদেশি (যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি) রিভলবার জব্দ করে বিজিবি। এর আগে ৩১ অক্টোবর দোয়ারাবাজার উপজেলার পাশ্ববর্তী ছাতক উপজেলার সীমান্তবর্তী ছনবাড়ী এলাকা থেকে একটি বিদেশি রিভলবার, দুটি ডেটোনেটর এবং প্রায় ২৫০ গ্রাম উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। পরে সেনাবাহিনীর সহায়তায় বিস্ফোরকগুলো নিষ্ক্রিয় করা হয়।
বিজিবি সূত্র জানায়, গত এক বছরে অন্তত ৫০ কোটি টাকার মাদক ও বিভিন্ন চোরাই পণ্য জব্দ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটলেও চোরাচালান বন্ধ হয়নি। প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে ফজরের আজান পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চলে।
বাংলাবাজার ও নরসিংপুর এলাকা হচ্ছে চোরাকারবারিদের মধ্যস্থতার প্রধান পথ। বিশেষ করে বাংলাবাজার ইউনিয়নের কলাউরা পয়েন্ট এবং নরসিংপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর ও শ্যামারগাঁও এলাকায় তারকাঁটার বেড়া না থাকায় সহজেই মাদক, অস্ত্র ও চোরাই পণ্য প্রবেশ করছে।
স্থানীয়দের আরও দাবি, কিছু জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তি এই পাচার বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সোর্স ব্যবহার করে পাচারকারীরা অর্থ লেনদেন করে থাকে, যার ফলে নিয়মিত অভিযান হলেও বড় কোনো চক্র ধরা পড়ে না।
সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, বিভিন্ন পয়েন্টে বিজিবি, পুলিশ, ডিবি ও র্যাবের সোর্স রয়েছে। তাদের মাধ্যমেই অবৈধভাবে পাচার বাণিজ্যের অর্থ লেনদেন হওয়ার কারণে কোনো সংস্থাই ভারতীয় চোরাচালানি পণ্য আটক করছে না। মাঝেমধ্যে লোক দেখানো দু-একটি অভিযান হলেও আসামিকে ধরা হয়নি। কারণ চোরাচালানিরা মিলেই মাসে দু-চারটি অভিযান সফল করতে সহায়তা করে থাকেন।
দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্ত এলাকায় ৬টি বিওপি ক্যাম্প রয়েছে। চোরাচালানি রুট হিসাবে বাংলাবাজার ইউনিয়নের কলাউরা ও নরসিংপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর-শ্যামারগাঁএ এলাকায় প্রতি রাতে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়ে থাকে। সীমান্তের যে সব এলাকা চোরাচালানি ঘাট হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে বাংলাবাজার ইউনিয়নের কলাউরা ১২৩৬ পিলার, শিমুলতলা, বাঁশতলা, পেকপাড়া, বোগলাবাজার ইউনিয়নের বাগানবাড়ী, গাছগড়া, ইদুকোনা লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ভাংগাপাড়া, মাঠগাঁও, দৌলতপুর, নরসিংপুর ইউনিয়নের শ্যামারগাঁও -১২৩৯ পিলার,শ্রীপুর ১২৪০ পিলার, চাইরগাঁও ১২৪১ পিলার। এতে বেশির ভাগই অপরাধে জড়িত হচ্ছে কিশোর ও স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (ছাতক-দোয়ারা) সার্কেল শেখ মো. মুরসালিনবলেন,“চোরাচালান রোধে পুলিশ কাজ করছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে সঙ্গে সঙ্গে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
৪৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক বলেন, “উর্ধ্বতন সদর দপ্তরের নির্দেশনায় সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। চোরাচালান, মাদক ও অস্ত্র পাচার প্রতিরোধে বিজিবির অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সীমান্তে যে কোনো অবৈধ তৎপরতা মোকাবিলায় আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।”



