মাহফুজ কাউসার ছাদি: সিলেটের ভোলাগঞ্জে অবস্থিত সাদাপাথর একসময় ছিল প্রকৃতির অনন্য নিদর্শন। উঁচু পাহাড়ে ঘেরা সবুজের মায়াজাল, ঝরনার শীতল পানির অশান্ত স্রোত, স্বচ্ছ নীল জল আর পাথরের বিছানা পর্যটকদের মুগ্ধ করত। শহুরে যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতেন এই প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করতে। কিন্তু সেই মনোমুগ্ধকর সাদাপাথর এখন প্রায় পাথরশূন্য বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছে। পাথর খেকোরা অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন ও লুঠপাট করে সাদাপাথরকে ধ্বংস করে ফেলেছে। অবশেষে পর্যটক ও সাধারণ জনগণের চাপের মুখে জেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
গত বছরের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই ভোলাগঞ্জের সাদাপাথরে অবাধে ও প্রকাশ্যে লুটপাট চলে আসছিল। সম্প্রতি বেপরোয়া পাথর লুটের ফলে এলাকাটি ব্যাপকভাবে পাথরশূন্য হয়ে পড়েছে। বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক নিন্দা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও, সমালোচনাকে উপেক্ষা করেই পাথর লুট অব্যাহত রয়েছে।
মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) রাত ৮টার দিকে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ সড়ক দিয়ে পাথরবোঝাই শত শত ট্রাক চলাচলের চিত্র ধরা পড়ে। এছাড়া, ধোপাখোলা বাজার-কোম্পানীগঞ্জ সড়কের দুপাশে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বেশ কিছু ক্রাসার (পাথর চূর্ণ করার যন্ত্র) বসানো হয়েছে। এসব ক্রাসারে ভোলাগঞ্জ থেকে লুট করে আনা সাদা পাথর এবং স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের মেঘালয় থেকে আমদানিকৃত পাথর গুঁড়ো করা হচ্ছে। লুট করা সাদাপাথর আমদানিকৃত পাথরের সঙ্গে মিশিয়ে চালানে সারা দেশে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিনের সকল পদ গত সোমবার রাতে স্থগিত করেছে বিএনপি। তবে এই ঘটনায় সরাসরি প্রশাসনকেই দায়ী করছেন রাজনৈতিক নেতারা। সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান লোদী (কয়েস লোদী) দেশের বাইরে থেকে বলেছেন, “সাদাপাথরে পাথর চুরি হওয়ার ঘটনাটির বিষয়ে অবগত রয়েছি। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ঘটনা। এর জন্য একমাত্র দায়ী প্রশাসন।” একই দলের সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট ইমরান আহমদ চৌধুরী মন্তব্য করেন, “সাদাপাথরের পাথর চুরি হওয়া সিলেটবাসীর জন্য লজ্জাজনক। বিএনপি এসব পরিবেশবিরোধী কাজ কখনোই সমর্থন করে না। এজন্য আমরা একজনকে বহিষ্কার করেছি। তবে এজন্য মূল দায়ী হচ্ছে প্রশাসন। প্রশাসন সাদাপাথর রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।”
সিলেট জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জয়নাল আবেদিন আরও তীব্র ভাষায় প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে বলেন, “এখন সাদাপাথরের পাথর নাই হয়ে গেছে। এর জন্য দায়ী সিলেটের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, বিভাগীয় কমিশনার ও বিজিবি। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্টেক হোল্ডার যারা আমাদের সীমান্ত পাহারা দেবে, যারা আমাদের সম্পদের পাহারা দেবে ও যারা জনগণের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবে, তারা রাষ্ট্রের এ অন্যতম পর্যটন শিল্পকে রক্ষা করতে পারেনি।” তিনি অভিযোগ করেন, “আমাদের অনেক দাবি ছিল, পাথর কোয়ারিগুলো ইজারা দেওয়া হোক। তারা ইজারা না দিয়ে ফাঁকি দিয়ে উন্মুক্ত করে দিলেন। সাধারণ মানুষ উন্মুক্ত মাল মনে করে যে যার মতো সবাই বাড়ি ঘরে নিয়ে গেছে।” জেলা প্রশাসককে উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেন, “তিনিই এগুলো উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। উনি আবার ঘোষণা দিক পাথরগুলো ফেরত দেওয়ার জন্য। সিলেটের পুলিশ সুপার এবং সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারের অফিসের সকলেই জানেন কারা পাথর নেয়।”
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর কেন্দ্রীয় সদস্য ও বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ বলেন, “সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্র ধ্বংসের একমাত্র দায় প্রশাসনের। আমরা প্রথম থেকেই পাথর চুরির বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনকে বারবার সতর্ক করেছি, কিন্তু তারা কোনো গুরুত্ব দেয়নি। ফলস্বরূপ, আজ সাদাপার্থর সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়েছে – এজন্য পুরো দায় প্রশাসনকেই বহন করতে হবে।”
খেলাফত মজলিস কেন্দ্রীয় উলামাবিষয়ক সম্পাদক আলী হাসান উসামা বলেন, “আমার নির্বাচনী ইশতেহারে বৈধ ও পরিবেশসম্মত উপায়ে প্রশাসনের মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পাথর উত্তোলনের একটি প্রস্তাব রয়েছে। পাথর কোয়ারি খুলে দিয়ে যদি প্রশাসনের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে সনাতন পদ্ধতিতে পরিবেশবান্ধবভাবে পাথর উত্তোলন করা হতো, তাহলে মানুষ অবৈধ পথে পা বাড়াত না। আমি এই পাথর লুটপাটের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।”
সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন বলেন, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ থানার ধলাই নদীর উৎসস্থলে অবস্থিত “সাদা পাথর” নামে পরিচিত স্থান থেকে গত বছর (জুলাই-আগস্ট ২০২৪) রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে প্রায় এক বছরে শত শত ট্রাক ও ট্রলার বোঝাই করে সাদা পাথর ও সিলিকা বালু অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এগুলো আকারে বড় ও বিপুল পরিমাণের হওয়ায় লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এই অপহরণের সময় সেখানে পুলিশ প্রশাসন, আনসার, বিজিবি এবং সেনাবাহিনীও উপস্থিত ছিল। এত সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও এই বিশাল পরিমাণ পাথর-বালু চুরি হয়ে যাওয়ায় তার দায়ভার সরাসরি প্রশাসনের উপর বর্তায়। প্রশাসনের উচিত ছিল এই চুরিকৃত পাথর-বালুর গন্তব্য খুঁজে বের করা। সম্ভব হলে সেগুলো ফেরত আনা হোক, অন্যথায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু প্রশাসন তা করছে না।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে গঠিত তদন্ত কমিটি অত্যন্ত বিলম্বে গঠিত হয়েছে। গত এক বছর ধরে এই লুটপাট চলেছে, পরিবেশবাদীগণ ও গণমাধ্যম প্রতিনিয়ত প্রতিবাদ জানালেও প্রশাসন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এটি সুস্পষ্ট দায়িত্বে অবহেলা। তবে তদন্ত কমিটিকে অবশ্যই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দেখতে হবে। কত কোটি টাকার পাথর-বালু লুটপাট হয়েছে তা খুঁজে বের করতে হবে। চুরি হওয়া পাথর-বালু উদ্ধারের পদক্ষেপ নিতে হবে। এই অপকর্মে জড়িত সকল ব্যক্তি/গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এই অবৈধ কার্যক্রমের ফলে পরিবেশ ও দেশের অর্থনীতির মারাত