সোহেল মিয়া, দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ):
তেগাংগা নামে ছোট্ট একটি গ্রাম। সেখানে ১০০টির মতো পরিবার বসবাস করেন। তবে গ্রামটিতে ঢোকার কোনো ধরনের রাস্তা নেই। হাওরের মাঝখানে অবস্থিত গ্রামটির চারপাশে শুধু পানি আর পানি। দেখে যে-কেউরই মনে হবে এ যেনো কোন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। শুকনো মৌসুমে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির আইল আর বর্ষায় নৌকা দিয়ে হাটবাজার ও জেলা-উপজেলা শহরে আসা যাওয়া করে আসছেন বাসিন্দারা।
বর্ষাকালে গ্রামটির চারপাশে পানি থৈ থৈ করে। তখন নৌকা ছাড়া বাড়ি থেকে বের হতে পারে না কেউ। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে স্কুল-মাদরাসার শিশু শিক্ষার্থীদের।
এছাড়াও রাস্তা না থাকায় গ্রামের বাসিন্দারা তাদের প্রাপ্ত বয়সি ছেলেমেদের ভাল কোনো পরিবারে বিয়ে দিতে পারছেন না।
অসহায় এই গ্রামটির অবস্থান সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলা সদর ইউনিয়নে। গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে তাদের দুর্ভোগের এসব তথ্য জানা গেছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) বেলা ১২ টায় গ্রামের সাথে একটি সংযোগ রাস্তা নির্মানের দাবিতে মানববন্ধন করে এলাকাবাসী।
গ্রামবাসীর দাবি, নামেই তারা উপজেলা সদরে বসবাস করেন। দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা তারা এটি শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। তবে কাজের কিছুই নেই।
গ্রামে প্রবেশের জন্য মাত্র দেড় কিলোমিটার একটি রাস্তা নির্মাণ করে দিলেই তারা ভয়াবহ এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবেন।
স্থানীয়রা আরো জানান, ১০০ পরিবারের বসবাসরত এই গ্রামের মধ্যভাগ বরাবর স্থানে পানিতে ভেঙে গিয়ে সেখানেও দেখা দিয়েছে গ্রামবাসীর ফাটল। এতে একই গ্রাম আবার দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে। গ্রামটিকে একত্রে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন এখন একটি কালভার্ট। গ্রামের মধ্যভাগে ভেঙে যাওয়া স্থানে একটি কালভার্ট নির্মান হলে যেমন একত্রে থাকতে পারবে গ্রামবাসী, তেমনি দেড় কিলোমিটার একটি সড়ক নির্মান হলে হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং চিকিৎসা কেন্দ্রসহ সর্বত্র যাতায়াত করতে পারবেন গ্রামের বাসিন্দারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তেগাংগা গ্রামে প্রবেশের জন্য কোনো রাস্তা নেই। বর্ষায় তারা নৌকা দিয়ে চলাচল করে। আর শুকনো মৌসুমে দেখা দেয় বেশি দূর্ভোগ। ছোট ছোট খাল আর ফসলি জমি মাড়িয়ে চলাচল করতে হয় তাদের। জরুরি রোগি পরিবহনে সীমাহীন ক্ষতির সম্মুখীন পড়তে হয় গ্রামের বাসিন্দাদের।
এমন অবস্থায় ওই গ্রামের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের যেন শেষ নেই।
রাস্তা ও কালভার্ট নির্মানের দাবিতে মানববন্ধনে গ্রামবাসী বলেন, আমাদের ছোট্ট এই গ্রামে ১০০টি পরিবারের প্রায় হাজারো মানুষ বসবাস করেন। গ্রামে শতভাগ বিদ্যুৎ আছে। তবে গ্রামের ঢোকার কোনো রাস্তা নেই। রাস্তা না থাকায় আমাদের দুর্ভোগের শেষ নেই।
শুকনো মৌসুমে কাদামাটি পারি দিয়ে আর বর্ষায় নৌকা দিয়ে হাট-বাজার ও উপজেলায় যেতে হয়। নেই কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তার কারনে গ্রামের বাহিরে গিয়ে শিক্ষাঅর্জন করতে পারেনা আমাদের শিশুরা। তাই বাধ্য হয়ে দারুলউলুম তেগাংগা মাদ্রাসা নামে গ্রামবাসীর অর্থায়ানে প্রতিষ্ঠিত ছোট একটি নুরানি মাদ্রাসায় কোন রকম ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করছে গ্রামের তিন শতাধিক শিশু।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, এমন অবস্থায় বিশেষ করে গ্রামের কেউ হঠাৎ অসুস্থ হলে বা কোনো গর্ভবতী নারীর সমস্যা হলে দ্রুত যে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাবো, সেই সুযোগ নেই। রাস্তা না থাকায় শুধু দুর্ভোগ পোহাতেই হচ্ছে না আমাদের, ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেওয়া নিয়েও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল না থাকায় কেউ আমাদের সাথে আত্মীয় করতে চায় না।
এবিষয়ে দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ জানান, তেগাংগা গ্রামেে মানুষের চলাচলের সড়ক না থাকায় চরম ভোগান্তিতে আছে স্থানীয়রা।
বর্ষায় তারা নৌকায় চলাচল করে আর শুকনোতে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ হলো তাদের চলাচলের ভরসা। যদি ব্লক দিয়ে স্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ করা হয় তাহলে গ্রামবাসীর চলাচলের উন্নতি হবে।
গ্রামের ভিতরে ভেঙে যাওয়া স্থানে কালভার্ট নির্মানের প্রস্থাবনা পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরুপ রতন সিংহ বলেন, “তেগাংগা গ্রামের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে।”
