সোহেল মিয়া, দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ): সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার সীমান্ত এলাকায় মাদক ও বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালান আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মধ্যে মাদক ও চোরাচালান পণ্য জব্দ করলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে এ অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মধ্যে বাহক বা ছোটখাটো জড়িত ব্যক্তিরা ধরা পড়লেও গডফাদাররা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। এতে করে অল্প সময়ে অধিক অর্থ উপার্জনের লোভে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি চোরাচালানের সঙ্গে জাল টাকার সংযোগের গুঞ্জনও উঠেছে। জানা গেছে, বিগত সরকারের সময় ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়ে থাকা অনেক মাদক কারবারি বর্তমানে নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সরকার পরিবর্তনের সময় কেউ আত্মগোপনে থাকলেও অনেকে আবার এলাকায় ফিরে পুরোনো নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন করছে। এমনকি দেশের বাইরে থেকেও কেউ কেউ এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সর্বশেষ গত শুক্রবার (৪ এপ্রিল) রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের মোল্লাপাড়া এলাকায় র্যাব-৯ অভিযান চালিয়ে ৯৩ বোতল বিদেশি মদ জব্দ করে। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও মূল চোরাচালানকারীরা ধরা না পড়ায় কার্যক্রম থেমে নেই। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীমান্ত এলাকার কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে, যার ফলে চোরাচালান কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চলতে পারছে।
নরসিংপুর, বাংলাবাজার, বোগলাবাজার ও লক্ষীপুর ইউনিয়নের সীমান্ত সড়কগুলো বর্তমানে চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, যে পরিমাণ মাদক জব্দ হচ্ছে তার চেয়ে বেশি পরিমাণ নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় অর্ধশত পাইকারি মাদক কারবারি সক্রিয় রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং বর্তমানে আড়াল থেকে নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে।
এই অবৈধ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এলাকায় সহিংস ঘটনাও ঘটছে। গত এক বছরে সীমান্তে চোরাচালান সংশ্লিষ্ট ঘটনায় নরসিংপুরের আহাদ মিয়া, বোগলাবাজারের শফিকুল ইসলাম এবং বাংলাবাজারের কুটি মিয়া (৫০) নিহত হয়েছেন।
এদিকে, আগে সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নিয়মিত উপস্থিতি থাকলেও বর্তমানে তা কমে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে চোরাকারবারিরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সীমান্তে কঠোর নজরদারি চলছে এবং মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (ছাতক-দোয়ারা সার্কেল) শেখ মো. মুরসালিন বলেন, “চোরাচালান রোধে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাই।”
সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক বলেন,“উর্ধ্বতন নির্দেশনায় সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। মাদক, অস্ত্র ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির অভিযান ও গোয়েন্দা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।”
তবে সচেতন মহলের মতে, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং চোরাচালান সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়।



